ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার নিজকুঞ্জরা বিসিক শিল্পনগরী। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে ফেনী নদীর তীরে প্রায় ১৮ একর জায়গাজুড়ে ১৯৮৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর গড়ে ওঠা এ শিল্পনগরী একসময় সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। চার দশকের কাছাকাছি সময়ে এখানে গড়ে উঠেছে ৪০টি শিল্প ইউনিট। কিন্তু দীর্ঘদিনেও পূর্ণাঙ্গ সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ না হওয়া, ধারাবাহিক চুরি, নিরাপত্তাহীনতা, মাদকাসক্তদের আড্ডা, জলাবদ্ধতা ও অবকাঠামোগত নানা সমস্যায় শিল্পনগরীটির সেই সম্ভাবনা এখন অনেকটাই ম্লান।
শিল্পমালিকদের অভিযোগ, নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় একের পর এক কারখানায় চুরি হচ্ছে। চুরি যাচ্ছে মূল্যবান মালপত্র। এমনকি পল্লী বিদ্যুতের ট্রান্সফরমারও চুরির শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা উদ্যোক্তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও হতাশা। প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ ও একাধিকবার যোগাযোগ করেও কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার মিলছে না বলে দাবি তাদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নিজকুঞ্জরা বিসিক শিল্পনগরীতে মোট ৪০টি শিল্প ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে কেমিক্যাল শিল্প ৯টি, বস্ত্র ২টি, প্রকৌশল ৪টি, খাদ্য ও খাদ্যজাত ১৬টি, পেপার বোর্ড ২টি, রাবার ২টি এবং প্লাস্টিক শিল্পের একটি ইউনিট রয়েছে। তবে বর্তমানে এসব ইউনিটের মাত্র ১০ থেকে ১২টি উৎপাদনে রয়েছে। বাকি কারখানাগুলোর অনেকগুলোই পুঁজি সংকট, অবকাঠামোগত সমস্যা ও অন্যান্য কারণে বন্ধ হয়ে গেছে।
শিল্পনগরীর নিরাপত্তার অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে অসম্পূর্ণ সীমানাপ্রাচীরকে। প্রতিষ্ঠার প্রায় ৩৯ বছর পার হলেও পুরো শিল্পনগরী ঘিরে কার্যকর সীমানাপ্রাচীর নির্মিত হয়নি। ফলে বিভিন্ন দিক দিয়ে সহজেই লোকজনের প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। রাতের বেলায় এ পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে বলে শিল্পমালিকদের অভিযোগ।
বিসিক শিল্পমালিক সমিতির কার্যকরী সদস্য মীর হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শিল্পনগরীর নিরাপত্তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। প্রায়ই কারখানার মূল্যবান মালামাল চুরি হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুতের ট্রান্সফরমারও চুরি হয়েছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে মালিকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
শিল্পমালিকদের আরেকটি অভিযোগ, সন্ধ্যা নামার পর শিল্পনগরীর বিভিন্ন স্থানে মাদকাসক্তদের আড্ডা বসে। এ কারণে কারখানার শ্রমিক ও মালিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাতে কারখানা বন্ধ করে বাড়ি ফেরার সময় ছিনতাইয়ের আশঙ্কায় অনেকেই আতঙ্কে থাকেন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে জড়িত কাউকে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। শিল্পমালিক ও স্থানীয়দের ভাষ্য, সন্ধ্যার পর শিল্পনগরীতে নিয়মিত নিরাপত্তা নজরদারি বাড়ানো গেলে এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
মীর হোসেন বলেন, ‘‘গভীর রাতে কারখানা বন্ধ করে অনেক সময় লাখ লাখ টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। কিন্তু নিরাপত্তার ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না থাকায় সবসময় একটা ভয় কাজ করে। সন্ধ্যার পর শিল্পনগরীর পরিবেশও স্বাভাবিক থাকে না।’’
শুধু নিরাপত্তা নয়, অবকাঠামোগত সংকটও পিছু ছাড়ছে না শিল্পনগরীটির। শিল্পমালিকদের অভিযোগ, শিল্পনগরীর নর্দমাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ভরাট হয়ে আছে। কোথাও কোথাও নর্দমা ভেঙে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রত নিষ্কাশন হতে পারে না। সামান্য বৃষ্টিতেই বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।
শিল্পনগরীর মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক এলাকায় এ ধরনের জলাবদ্ধতা উৎপাদন ও পণ্য পরিবহনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, কারখানার নিরাপত্তার পাশাপাশি রাস্তা, ড্রেনেজ ও অন্যান্য অবকাঠামোর উন্নয়নও জরুরি।
উদ্যোক্তাদের মতে, শিল্পনগরীতে বিনিয়োগের প্রধান উদ্দেশ্য হলো নিরাপদ পরিবেশে উৎপাদন ও ব্যবসা পরিচালনা করা। কিন্তু বছরের পর বছর একই ধরনের সমস্যা চলতে থাকলে নতুন উদ্যোক্তারা এখানে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাতে পারেন। এর প্রভাব পড়তে পারে কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও।
৪০টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ১০-১২টি উৎপাদনে থাকা শিল্পনগরীর সামগ্রিক সম্ভাবনার তুলনায় উদ্বেগজনক চিত্র বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বন্ধ ইউনিটগুলো চালু করা এবং নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে আগে নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান করতে হবে।
শিল্পমালিকদের প্রত্যাশা, শিল্পনগরীর পুরো এলাকা ঘিরে দ্রত সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ, নিয়মিত পুলিশি টহল এবং প্রয়োজনীয় স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে ভরাট ও ভেঙে যাওয়া নর্দমা সংস্কার, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নত করা এবং সড়ক অবকাঠামোর প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নিজকুঞ্জরা বিসিক শিল্পনগরী শুধু কয়েকটি কারখানার সমষ্টি নয়; এটি স্থানীয় কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। দীর্ঘদিনের সমস্যা কাটিয়ে শিল্পনগরীটিকে কার্যকর ও নিরাপদ করা গেলে বন্ধ শিল্প ইউনিটগুলো পুনরায় চালু হওয়ার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন বিসিক কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ।
শিল্পমালিকদের এখন একটাই প্রত্যাশা- চুরি, মাদক ও জলাবদ্ধতার সমস্যায় জর্জরিত নিজকুঞ্জরা বিসিক আবারও প্রাণ ফিরে পাক। বিনিয়োগকারীদের আতঙ্ক নয়, নিরাপদ কর্মপরিবেশই হোক এ শিল্পনগরীর নতুন পরিচয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিসিক শিল্প নগরী নিজকুঞ্জরা, ফেনী শিল্পনগরী কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে মাদকসেবীদের আড্ডা ও চুরি ঘটনা নিয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সাথে বারবার অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু আদৌ কোন সুরাহা মেলেনি। তিনি এ নিয়ে উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা বিরাজ করছে স্থানীয়দের মাঝে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে ওই এলাকায় সীমানা প্রাচীর, স্ট্রিট লাইটের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রাক্কলন পাঠানো হয়েছে। আশা করি আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া যাবে।
আপনার মতামত লিখুন