আলোকিত গণমাধ্যম

কারখানা নাকি জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি? সোনাগাজীর মুহুরী প্রজেক্টের ‘রাজিব মিষ্টি মেলা’ অনুমোদন ছাড়াই একাধিক মিষ্টি-জুস বাজারজাত



কারখানা নাকি জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি?  সোনাগাজীর মুহুরী প্রজেক্টের ‘রাজিব মিষ্টি মেলা’  অনুমোদন ছাড়াই একাধিক মিষ্টি-জুস বাজারজাত

 পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জায়গায় অনুমোদন ছাড়াই স্থাপনা নির্মাণ করে মিষ্টি ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদনের অভিযোগ উঠেছে ‘মেসার্স রাজিব মিষ্টি মেলা’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। প্রায় ছয় বছর ধরে চলা প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদনকেন্দ্রে নেই ট্রেড লাইসেন্স, ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন, স্যানিটারি বা স্বাস্থ্যসংক্রান্ত অনুমোদন।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি যে স্থানে কারখানা স্থাপন করেছে, সেটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা। সেখানে স্থাপনা নির্মাণের কোনো লিখিত অনুমোদন নেই। তবে প্রতিষ্ঠানটির মালিক রাজিব কুমার দাশ দাবি করেছেন, কারখানা স্থাপনের জন্য প্রায় ছয় বছর আগে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফেনী শাখার এক কর্মকর্তাকে নগদ এক লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল। ওই কর্মকর্তার নাম তিনি জানেন না এবং বর্তমানে তিনি অন্যত্র বদলি হয়েছেন বলে দাবি করেন রাজিব। টাকা দেওয়ার কোনো রসিদ বা লিখিত প্রমাণও তার কাছে নেই। তার ভাষ্য, ওই অর্থ দেওয়ার পর তাকে মৌখিকভাবে ঘর নির্মাণ করে কারখানা পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

সরেজমিনে দেখা যায়, সোনাগাজী উপজেলার মুহুরী প্রজেক্টের ৪০ গেইট এলাকায় টিনের ঘরে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। উৎপাদনস্থলের মেঝে স্যাঁতসেঁতে। দেয়ালে ময়লা ও ছত্রাকের উপস্থিতি দেখা যায়। উৎপাদনকেন্দ্রের আশপাশে বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা গেছে। নেই কোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা। কারখানার পেছনে থাকা টয়লেটও অপরিষ্কার।

উৎপাদনস্থলটি প্রধান সড়কের পাশে হওয়ায় যানবাহন চলাচলের কারণে ধুলাবালির উপস্থিতিও চোখে পড়ে। একই সঙ্গে নদীর পাড়ের অবস্থানের কারণে মশার উপদ্রব রয়েছে। সরেজমিনে কিছু কাঁচামাল মেঝেতে এবং দুধ, ছানা, চিনি ও অন্যান্য উপকরণ খোলা অবস্থায় রাখা দেখা যায়। তৈরি পণ্যের কিছু অংশ ফ্রিজে রাখা হলেও অন্য কিছু পণ্য খোলা জায়গায় রাখা হয়। কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য আলাদা করে সংরক্ষণের ব্যবস্থাও দেখা যায়নি।

কারখানায় উৎপাদনকাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত পোশাক, এপ্রোন, হেয়ারনেট বা ক্যাপ এবং গ্লাভস ব্যবহারের ব্যবস্থা নেই। সরেজমিনে একজন কর্মীকে খালি গায়ে খাদ্যপণ্য তৈরির কাজে নিয়োজিত থাকতে দেখা যায়। প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণে ওই কর্মীর শরীরের ঘাম খাদ্য তৈরির কাঁচামালের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে। কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা মেডিকেল সার্টিফিকেট নেই বলেও জানা গেছে। খাবার তৈরির সময় কর্মীদের মোবাইল ব্যবহারসহ অন্যান্য অনিরাপদ কর্মকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে।

পানির ক্ষেত্রেও রয়েছে প্রশ্ন। উৎপাদনকেন্দ্রে স্থানীয় নলকূপের পানি এবং নদীর পানি ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পানি সংরক্ষণের পাত্রও অপরিষ্কার অবস্থায় দেখা গেছে। পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই বলে সরেজমিনে দেখা যায়।

প্রতিষ্ঠানটির তৈরি পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে স্পঞ্জ মিষ্টি, কালোজাম, লালজাম, রসমালাই, ছানাবালুসা, দধি, মাঠা, হোয়ি প্রোটিন অরেঞ্জ জুস, লাচ্ছি ও ঘি। এসবের মধ্যে দধি, মাঠা ও ঘির বিএসটিআই সনদ রয়েছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির মালিক রাজিব। দধি ও মাঠার ক্ষেত্রে একই লাইসেন্স নম্বর এবং ঘি’র জন্য পৃথক লাইসেন্স নম্বর ব্যবহার করা হচ্ছে।

তবে স্পঞ্জ মিষ্টি, কালোজাম, লালজাম, রসমালাই, ছানাবালুসা, লাচ্ছি এবং হোয়ি প্রোটিন অরেঞ্জ জুসের বিএসটিআই অনুমোদন নেই বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক। বিএসটিআই এর লাইসেন্স পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন মীরসরাই উপজেলার ওসমানপুর এলকার মুহুরী প্রজেক্ট বাজারে কারখানার অনুমোদন হলেও কারখানাটি মূলত সোনাগাজী উপজেলার সদর ইউনিয়নের থাক-খোয়াজের লামছি গ্রামের মুহুরী প্রজেক্ট এলাকার মধ্যে অবস্থিত। এছাড়া টক ও মিষ্টি দই এবং মাঠার ক্ষেত্রে আগে অনুমোদন থাকলেও সেটির মেয়াদ ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে শেষ হয়েগেছে। অথচ এসব পণ্য নিয়মিত উৎপাদন ও বাজারজাত করা হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির কোনো ফার্ম বা কোম্পানি নিবন্ধন নেই বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। ট্রেড লাইসেন্সও বর্তমানে নেই। এ বিষয়ে রাজিব কুমার দাশের দাবি, আগে একটি ট্রেড লাইসেন্স ছিল। একবার প্রতিষ্ঠানটিতে স্থানীয় চাঁদাবাজদের হামলার সময় সেটির কাগজপত্র নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর আর নতুন করে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়নি।

মালিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ছয় বছর ধরে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে চার থেকে পাঁচজন শ্রমিক কাজ করছেন। সব পণ্য মিলিয়ে প্রতিদিন এক থেকে দেড় লাখ টাকার পণ্য উৎপাদন করা হয়। এসব পণ্য মুহুরী প্রজেক্ট, মুহুরী প্রজেক্ট বাজার, মিরসরাই, সোনাপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় বাজারজাত করা হয়। তার পরিচালিত মুহুরী প্রজেক্ট বাজারে আরো একটি দোকান চলমান রয়েছে।

সরেজমিনে পাওয়া তথ্য ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হলেও খাদ্য উৎপাদনের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয় আবদুল হক, মোশারফ হোসেন, সাইফুল ইসলামসহ আরো কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, কারখানায় স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মানা হয় না। উৎপাদনকেন্দ্রের আশপাশে ধুলাবালি, মশা-মাছি ও দুর্গন্ধের সমস্যাও রয়েছে। কারখানার পাশেই বর্জ্য ফেলা হয়। তাদের ভাষ্য, সরকারি জমিতে স্থাপনা নির্মাণ করেই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে। তবে এর আগে এ নিয়ে কোনো সরকারি অভিযান হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তারা অবগত নন।

অন্যদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে রাজিব কুমার দাশ নিজেই লিখিত কোনো অনুমোদন নেই বলে স্বীকার করেছেন। তার দাবি, এখানে যতগুলো দোকান আছে, কোনোটিরই অনুমোদন নেই। সবগুলোর যে গতি, তারও একই গতি।

এ বিষয়ে রাজিক কুমার দাশ বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তাকে এক লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল। ওই কর্মকর্তা বর্তমানে এখানে নেই এবং তার নামও তিনি জানেন না। ঘর নির্মাণ করে কারখানা চালু করার জন্য ওই টাকা দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি। সকল পণ্যের বিএসটিআই অনুমোদন না থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন এবং প্রয়োজন হলে অনুমোদন নেবেন। কারখানায় স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মানা না হওয়ার বিষয়ে তার দাবি, লোকবল সংকটের কারণে সবকিছু ঠিকমতো করা সম্ভব হচ্ছে না। স্থানীয় কয়েকজন রাজনীতিবিদ চাঁদা দাবি করে হামলা করার পর থেকে লোকবল সংকট আরও বেড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। কর্মীদের নির্ধারিত পোশাক না থাকার বিষয়ে রাজিক বলেন, তিনি একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হওয়ায় সবকিছুতে এখনো বিনিয়োগ করে উঠতে পারেননি। কারখানায় মাছি, মশা ও ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয় বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড, ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, টাকার বিনিময়ে মৌখিক অনুমোদন দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ ধরনের সব ইজারা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে কাউকে কোনো ইজারা দেওয়া হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা কেউ অবৈধভাবে দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করে থাকলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ বিষয়ে সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মারজান হোসাইন বলেন, বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। কারখানাটির স্থাপনা, জমির মালিকানা ও অনুমোদন, খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতের বৈধতা এবং স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণসহ সার্বিক বিষয় সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা হবে। পরিদর্শনে কোনো অনিয়ম বা অনুমোদনহীন কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রশ্ন উঠছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গায় লিখিত অনুমোদন ছাড়া একটি খাদ্য উৎপাদনকেন্দ্র কীভাবে প্রায় ছয় বছর ধরে পরিচালিত হচ্ছে? ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া এবং একাধিক পণ্যের বিএসটিআই অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও এসব খাদ্যপণ্য কীভাবে বাজারজাত হচ্ছে? আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে উৎপাদিত এসব খাদ্যপণ্যের মান ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কতটা কার্যকর, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

বিষয় : কারখানা নাকি জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি? সোনাগাজীর মুহুরী প্রজেক্টের ‘রাজিব মিষ্টি মেলা’ অনুমোদন ছাড়াই একাধিক মিষ্টি-জুস বাজারজাত (নিউজের মাঝে)

আপনার মতামত লিখুন

আলোকিত গণমাধ্যম

বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


কারখানা নাকি জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি? সোনাগাজীর মুহুরী প্রজেক্টের ‘রাজিব মিষ্টি মেলা’ অনুমোদন ছাড়াই একাধিক মিষ্টি-জুস বাজারজাত

প্রকাশের তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

 পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জায়গায় অনুমোদন ছাড়াই স্থাপনা নির্মাণ করে মিষ্টি ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদনের অভিযোগ উঠেছে ‘মেসার্স রাজিব মিষ্টি মেলা’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। প্রায় ছয় বছর ধরে চলা প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদনকেন্দ্রে নেই ট্রেড লাইসেন্স, ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন, স্যানিটারি বা স্বাস্থ্যসংক্রান্ত অনুমোদন।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি যে স্থানে কারখানা স্থাপন করেছে, সেটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা। সেখানে স্থাপনা নির্মাণের কোনো লিখিত অনুমোদন নেই। তবে প্রতিষ্ঠানটির মালিক রাজিব কুমার দাশ দাবি করেছেন, কারখানা স্থাপনের জন্য প্রায় ছয় বছর আগে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফেনী শাখার এক কর্মকর্তাকে নগদ এক লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল। ওই কর্মকর্তার নাম তিনি জানেন না এবং বর্তমানে তিনি অন্যত্র বদলি হয়েছেন বলে দাবি করেন রাজিব। টাকা দেওয়ার কোনো রসিদ বা লিখিত প্রমাণও তার কাছে নেই। তার ভাষ্য, ওই অর্থ দেওয়ার পর তাকে মৌখিকভাবে ঘর নির্মাণ করে কারখানা পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

সরেজমিনে দেখা যায়, সোনাগাজী উপজেলার মুহুরী প্রজেক্টের ৪০ গেইট এলাকায় টিনের ঘরে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। উৎপাদনস্থলের মেঝে স্যাঁতসেঁতে। দেয়ালে ময়লা ও ছত্রাকের উপস্থিতি দেখা যায়। উৎপাদনকেন্দ্রের আশপাশে বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা গেছে। নেই কোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা। কারখানার পেছনে থাকা টয়লেটও অপরিষ্কার।

উৎপাদনস্থলটি প্রধান সড়কের পাশে হওয়ায় যানবাহন চলাচলের কারণে ধুলাবালির উপস্থিতিও চোখে পড়ে। একই সঙ্গে নদীর পাড়ের অবস্থানের কারণে মশার উপদ্রব রয়েছে। সরেজমিনে কিছু কাঁচামাল মেঝেতে এবং দুধ, ছানা, চিনি ও অন্যান্য উপকরণ খোলা অবস্থায় রাখা দেখা যায়। তৈরি পণ্যের কিছু অংশ ফ্রিজে রাখা হলেও অন্য কিছু পণ্য খোলা জায়গায় রাখা হয়। কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য আলাদা করে সংরক্ষণের ব্যবস্থাও দেখা যায়নি।

কারখানায় উৎপাদনকাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত পোশাক, এপ্রোন, হেয়ারনেট বা ক্যাপ এবং গ্লাভস ব্যবহারের ব্যবস্থা নেই। সরেজমিনে একজন কর্মীকে খালি গায়ে খাদ্যপণ্য তৈরির কাজে নিয়োজিত থাকতে দেখা যায়। প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণে ওই কর্মীর শরীরের ঘাম খাদ্য তৈরির কাঁচামালের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে। কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা মেডিকেল সার্টিফিকেট নেই বলেও জানা গেছে। খাবার তৈরির সময় কর্মীদের মোবাইল ব্যবহারসহ অন্যান্য অনিরাপদ কর্মকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে।

পানির ক্ষেত্রেও রয়েছে প্রশ্ন। উৎপাদনকেন্দ্রে স্থানীয় নলকূপের পানি এবং নদীর পানি ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পানি সংরক্ষণের পাত্রও অপরিষ্কার অবস্থায় দেখা গেছে। পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই বলে সরেজমিনে দেখা যায়।

প্রতিষ্ঠানটির তৈরি পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে স্পঞ্জ মিষ্টি, কালোজাম, লালজাম, রসমালাই, ছানাবালুসা, দধি, মাঠা, হোয়ি প্রোটিন অরেঞ্জ জুস, লাচ্ছি ও ঘি। এসবের মধ্যে দধি, মাঠা ও ঘির বিএসটিআই সনদ রয়েছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির মালিক রাজিব। দধি ও মাঠার ক্ষেত্রে একই লাইসেন্স নম্বর এবং ঘি’র জন্য পৃথক লাইসেন্স নম্বর ব্যবহার করা হচ্ছে।

তবে স্পঞ্জ মিষ্টি, কালোজাম, লালজাম, রসমালাই, ছানাবালুসা, লাচ্ছি এবং হোয়ি প্রোটিন অরেঞ্জ জুসের বিএসটিআই অনুমোদন নেই বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক। বিএসটিআই এর লাইসেন্স পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন মীরসরাই উপজেলার ওসমানপুর এলকার মুহুরী প্রজেক্ট বাজারে কারখানার অনুমোদন হলেও কারখানাটি মূলত সোনাগাজী উপজেলার সদর ইউনিয়নের থাক-খোয়াজের লামছি গ্রামের মুহুরী প্রজেক্ট এলাকার মধ্যে অবস্থিত। এছাড়া টক ও মিষ্টি দই এবং মাঠার ক্ষেত্রে আগে অনুমোদন থাকলেও সেটির মেয়াদ ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে শেষ হয়েগেছে। অথচ এসব পণ্য নিয়মিত উৎপাদন ও বাজারজাত করা হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির কোনো ফার্ম বা কোম্পানি নিবন্ধন নেই বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। ট্রেড লাইসেন্সও বর্তমানে নেই। এ বিষয়ে রাজিব কুমার দাশের দাবি, আগে একটি ট্রেড লাইসেন্স ছিল। একবার প্রতিষ্ঠানটিতে স্থানীয় চাঁদাবাজদের হামলার সময় সেটির কাগজপত্র নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর আর নতুন করে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়নি।

মালিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ছয় বছর ধরে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে চার থেকে পাঁচজন শ্রমিক কাজ করছেন। সব পণ্য মিলিয়ে প্রতিদিন এক থেকে দেড় লাখ টাকার পণ্য উৎপাদন করা হয়। এসব পণ্য মুহুরী প্রজেক্ট, মুহুরী প্রজেক্ট বাজার, মিরসরাই, সোনাপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় বাজারজাত করা হয়। তার পরিচালিত মুহুরী প্রজেক্ট বাজারে আরো একটি দোকান চলমান রয়েছে।

সরেজমিনে পাওয়া তথ্য ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হলেও খাদ্য উৎপাদনের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয় আবদুল হক, মোশারফ হোসেন, সাইফুল ইসলামসহ আরো কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, কারখানায় স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মানা হয় না। উৎপাদনকেন্দ্রের আশপাশে ধুলাবালি, মশা-মাছি ও দুর্গন্ধের সমস্যাও রয়েছে। কারখানার পাশেই বর্জ্য ফেলা হয়। তাদের ভাষ্য, সরকারি জমিতে স্থাপনা নির্মাণ করেই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে। তবে এর আগে এ নিয়ে কোনো সরকারি অভিযান হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তারা অবগত নন।

অন্যদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে রাজিব কুমার দাশ নিজেই লিখিত কোনো অনুমোদন নেই বলে স্বীকার করেছেন। তার দাবি, এখানে যতগুলো দোকান আছে, কোনোটিরই অনুমোদন নেই। সবগুলোর যে গতি, তারও একই গতি।

এ বিষয়ে রাজিক কুমার দাশ বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তাকে এক লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল। ওই কর্মকর্তা বর্তমানে এখানে নেই এবং তার নামও তিনি জানেন না। ঘর নির্মাণ করে কারখানা চালু করার জন্য ওই টাকা দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি। সকল পণ্যের বিএসটিআই অনুমোদন না থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন এবং প্রয়োজন হলে অনুমোদন নেবেন। কারখানায় স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মানা না হওয়ার বিষয়ে তার দাবি, লোকবল সংকটের কারণে সবকিছু ঠিকমতো করা সম্ভব হচ্ছে না। স্থানীয় কয়েকজন রাজনীতিবিদ চাঁদা দাবি করে হামলা করার পর থেকে লোকবল সংকট আরও বেড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। কর্মীদের নির্ধারিত পোশাক না থাকার বিষয়ে রাজিক বলেন, তিনি একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হওয়ায় সবকিছুতে এখনো বিনিয়োগ করে উঠতে পারেননি। কারখানায় মাছি, মশা ও ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয় বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড, ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, টাকার বিনিময়ে মৌখিক অনুমোদন দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ ধরনের সব ইজারা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে কাউকে কোনো ইজারা দেওয়া হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা কেউ অবৈধভাবে দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করে থাকলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ বিষয়ে সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মারজান হোসাইন বলেন, বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। কারখানাটির স্থাপনা, জমির মালিকানা ও অনুমোদন, খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতের বৈধতা এবং স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণসহ সার্বিক বিষয় সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা হবে। পরিদর্শনে কোনো অনিয়ম বা অনুমোদনহীন কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রশ্ন উঠছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গায় লিখিত অনুমোদন ছাড়া একটি খাদ্য উৎপাদনকেন্দ্র কীভাবে প্রায় ছয় বছর ধরে পরিচালিত হচ্ছে? ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া এবং একাধিক পণ্যের বিএসটিআই অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও এসব খাদ্যপণ্য কীভাবে বাজারজাত হচ্ছে? আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে উৎপাদিত এসব খাদ্যপণ্যের মান ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কতটা কার্যকর, এখন সেটিই দেখার বিষয়।


আলোকিত গণমাধ্যম

সম্পাদকঃ সিদ্দিক আল-মামুন
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
কারখানা নাকি জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি? সোনাগাজীর মুহুরী প্রজেক্টের ‘রাজিব মিষ্টি মেলা’ অনুমোদন ছাড়াই একাধিক মিষ্টি-জুস বাজারজাত
0:00 0:00
1.0x